কলকাতায় আগুনে পুড়ে ছাই ৪,০০০ ইভিএম! নাশকতার অভিযোগে কাঁপছে রাজ্য-রাজনীতি

কলকাতা আলিপুরে ইভিএম গুদামে ভয়াবহ আগুন — ৪,০০০ ইভিএম পুড়ে ছাই

কলকাতায় ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই ৪,০০০ ইভিএম! নাশকতার অভিযোগে তোলপাড়, প্রশ্নের মুখে নির্বাচনী স্বচ্ছতা

দক্ষিণ কলকাতার আলিপুরে একটি সরকারি ভবনে আচমকা ভয়াবহ আগুন লেগে পুড়ে ছাই হয়ে গেল প্রায় ৪,০০০ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম। সদ্য সমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ব্যবহৃত এই যন্ত্রগুলি ১০টি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটগ্রহণের সাক্ষী ছিল। আগুনের অস্বাভাবিক বিস্তার দেখে রাজ্যের দমকল প্রতিমন্ত্রী নিজেই নাশকতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিতে পারেননি। ঘটনার পরেই পুলিশ এফআইআর দায়ের করে গঠন করেছে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট। রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক, প্রশ্ন উঠছে নির্বাচনী প্রমাণ সংরক্ষণ এবং গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা নিয়ে।

ঘটনাটি কী, কোথায় এবং কখন ঘটল?

পুলিশ ও দমকল দফতরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ জুন ২০২৬, বুধবার দক্ষিণ কলকাতার আলিপুর এলাকায় অবস্থিত একটি নয়তলা সরকারি ভবনে আগুন লাগে। এই ভবনে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের দফতর ছিল, সঙ্গে আরও বেশ কয়েকটি সরকারি বিভাগের অফিসও সেখানে কাজ করত।

সর্বশিক্ষা মিশন, মিড-ডে মিল প্রকল্প এবং উদ্যানপালন দফতরের অফিসও এই ভবনেই ছিল। তবে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হল, ভবনের উপরের তলাগুলিতে নির্বাচন সংক্রান্ত দফতর এবং ইভিএম রাখার স্ট্রংরুম অবস্থিত ছিল। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলি ভোট গণনার পরে এখানেই সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল।

আগুনের উৎস ও অস্বাভাবিক বিস্তার

রাজ্যের দমকল ও জরুরি পরিষেবা প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরীর বিবৃতি অনুযায়ী, আগুন প্রথমে ভবনের তিন তলায় ধরা পড়ে। কিন্তু তারপর তা চার, পাঁচ এবং ছয় তলাকে তেমন ক্ষতি না করেই সরাসরি সাত, আট এবং নয় তলায় ছড়িয়ে পড়ে— যেখানে ইভিএম এবং নির্বাচন সংক্রান্ত নথি রাখা ছিল।

এই অস্বাভাবিক প্যাটার্নই তদন্তকারীদের সন্দেহের মূল কারণ। সাধারণত আগুন একটি তল থেকে তার ঠিক উপরের বা নিচের তলায় ছড়ায়। কিন্তু এখানে মাঝের তলাগুলি প্রায় অক্ষত থেকে গেলেও উপরের তলাগুলি সম্পূর্ণভাবে পুড়ে গিয়েছে, যা স্বাভাবিক অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে বিরল।

দমকল বিভাগের কর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালান। ভবনের উচ্চতা এবং তাপমাত্রার কারণে আগুন নেভাতে যথেষ্ট সময় লেগে যায়, ফলে উপরের তলাগুলিতে রাখা ইভিএম এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।

কতগুলি ইভিএম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?

প্রাথমিক হিসেব অনুযায়ী, এই অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৪,০০০ ইভিএম সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কন্ট্রোল ইউনিট, ব্যালট ইউনিট এবং ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেল বা ভিভিপ্যাট মেশিন।

এই যন্ত্রগুলি রাজ্যের ১০টি বিধানসভা কেন্দ্রে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ব্যবহৃত হয়েছিল। রাজ্যের শাসক ও বিরোধী দলগুলির মধ্যে কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, এই কেন্দ্রগুলির মধ্যে কসবা, যাদবপুর, বেহালা পূর্ব, বেহালা পশ্চিম, মেটিয়াবুরুজ এবং সাতগাছিয়ার মতো কেন্দ্র অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। যদিও এই তালিকা চূড়ান্তভাবে নির্বাচন কমিশনের তরফে নিশ্চিত করা হয়নি।

প্রতিটি পোলিং বুথে সাধারণত একটি করে কন্ট্রোল ইউনিট, ব্যালট ইউনিট এবং ভিভিপ্যাট ব্যবহৃত হয়। সেই হিসেবে ৪,০০০ যন্ত্র অর্থাৎ প্রায় ১,৩০০-এর বেশি পোলিং বুথের ভোটগ্রহণের যন্ত্রপাতি একসঙ্গে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এত বিপুল সংখ্যক ইভিএম একসঙ্গে নষ্ট হওয়ার ঘটনা রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।

কর্মকর্তাদের বিবৃতি ও তদন্তের অগ্রগতি

দমকল প্রতিমন্ত্রীর বিবৃতি

ঘটনাস্থলে গিয়ে রাজ্যের দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, এই আগুন তাঁর কাছে "স্বাভাবিক" বলে মনে হচ্ছে না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আগুনের যেভাবে বিস্তার ঘটেছে, তা থেকে নাশকতার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবনের ৮ম এবং ৯ম তলায় নির্বাচন সংক্রান্ত দফতর ছিল এবং সেখানেই প্রায় ৪,০০০ ইভিএম সংরক্ষিত ছিল, যেগুলি ১০টি বিধানসভা কেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়েছিল। তিন তলায় আগুন লাগার পর তা চার-পাঁচ-ছয় তলাকে ছেড়ে সরাসরি উপরের তলায় কীভাবে পৌঁছাল, এই প্রশ্নই তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

পুলিশের তদন্ত এবং সিট গঠন

ঘটনার পরই কলকাতা পুলিশ একটি এফআইআর দায়ের করে এবং দ্রুত একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করে। পুলিশের নির্দেশনামা অনুযায়ী, এই সিটের নেতৃত্বে রয়েছেন একজন সহকারী পুলিশ কমিশনার, এবং তার সঙ্গে রয়েছেন গোয়েন্দা বিভাগের অভিজ্ঞ আধিকারিকরা।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। তবে আগুনের পর ভবনের নির্দিষ্ট অংশে তাপমাত্রা এখনও অত্যন্ত বেশি থাকায় বিস্তারিত পরীক্ষা চালাতে বিলম্ব হচ্ছে। ফরেনসিক দল মূলত খতিয়ে দেখছে, আগুন বিদ্যুৎ সংযোগের ত্রুটি থেকে লেগেছে, নাকি কোনও রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছে।

এর পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি ও প্রযুক্তিবিদরাও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। পুড়ে যাওয়া ইভিএমের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করে সেগুলির পরিচয় ও তথ্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব কিনা, তা নিয়েও খোঁজখবর শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত সরকারি ভবনের মধ্যে কীভাবে এত বড় নিরাপত্তা ত্রুটি ঘটতে পারল। দলের পক্ষ থেকে এই অগ্নিকাণ্ডকে নির্বাচন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, রাজ্য প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি। কংগ্রেস নেতা পবন খেরা এই ঘটনার পর সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, পুড়ে যাওয়া এই ৪,০০০ ইভিএম সত্যিই সদ্য সমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে ব্যবহৃত হয়েছিল কিনা, তা নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট করে জানানো উচিত।

নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত এই রাজনৈতিক অভিযোগগুলির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। ফরেনসিক রিপোর্ট আসার পরই বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যেতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।

নির্বাচন ও গণতন্ত্রের জন্য এই ঘটনা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এই ঘটনাটিকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে তার সময়। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ঠিক এক মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই এই অগ্নিকাণ্ড ঘটল। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে রাজ্যে ভোটদানের হার ছিল প্রায় ৯৪ শতাংশ, যা রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ। এমন একটি বহু-আলোচিত ও ঐতিহাসিক নির্বাচনের পরেই ভোটগ্রহণের যন্ত্র পুড়ে যাওয়ায় তা স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

ভারতের নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী, কোনও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আদালতে মামলা বা নির্বাচনী পিটিশন দাখিল হতে পারে, যার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। সেই সময়সীমার মধ্যে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ইভিএম এবং ভোটদানের নথি সংরক্ষণ করে রাখা বাধ্যতামূলক, যাতে প্রয়োজনে পুনঃগণনা বা আইনি পরীক্ষা করা সম্ভব হয়।

এই প্রেক্ষাপটে কোনও সরকারি ভবনে রাখা ইভিএম আগুনে পুড়ে যাওয়া মানে হল, প্রয়োজনে ভবিষ্যতে যদি কোনও প্রার্থী বা দল আদালতে যান, তাহলে তাঁদের হাতে আর মূল প্রমাণ অবশিষ্ট থাকবে না। এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঘটনাটি কেবল একটি অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং তা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বিষয়।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটদানের যন্ত্র এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করা প্রশাসনের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্বে কোনও খামতি ধরা পড়লে তা সরাসরি জনগণের ভোটাধিকারের প্রতি আস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

ঘটনার সম্পূর্ণ টাইমলাইন

নিচে এই ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলি ধাপে ধাপে তুলে ধরা হয়েছে।

তারিখ ঘটনা
১০ জুন ২০২৬ (বুধবার) আলিপুরের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদ ভবনে আগুন লাগে। আগুন তিন তলা থেকে শুরু হয়ে সরাসরি সাত-আট-নয় তলায় ছড়িয়ে পড়ে।
১০ জুন ২০২৬ দমকল বিভাগের একাধিক ইঞ্জিন দীর্ঘ সময় ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ চালায়। ভবনের উপরের তলায় থাকা ইভিএম স্ট্রংরুম সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১১ জুন ২০২৬ রাজ্যের দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় ৪,০০০ ইভিএম নষ্ট হওয়ার তথ্য জানান এবং আগুনের ধরন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
১১-১২ জুন ২০২৬ কলকাতা পুলিশ এফআইআর দায়ের করে এবং বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করে।
১২ জুন ২০২৬ ফরেনসিক দল ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ শুরু করে, যদিও উচ্চ তাপমাত্রার কারণে পুরো পরীক্ষা সম্ভব হয়নি।
১২ জুন ২০২৬ তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনাকে নাশকতা ও প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা বলে অভিযোগ তোলে। কংগ্রেস নেতা পবন খেরা নির্বাচন কমিশনের কাছে স্পষ্টীকরণ দাবি করেন।
১৩ জুন ২০২৬ (চলমান) নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিরা পুড়ে যাওয়া ইভিএমের অবশিষ্টাংশ পরিদর্শনের অপেক্ষায়। তদন্ত এখনও চলছে এবং ফরেনসিক রিপোর্ট প্রকাশের অপেক্ষা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল আগুনের প্যাটার্ন। সাধারণত বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে লাগা আগুন একটি নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করে ধাপে ধাপে ছড়ায়। কিন্তু এখানে মাঝের তলাগুলি অক্ষত রেখে উপরের তলায় সরাসরি আগুন পৌঁছানোর বিষয়টি প্রচলিত অগ্নিকাণ্ডের ধরন থেকে আলাদা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি ফরেনসিক রিপোর্টে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার বা ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগের প্রমাণ মেলে, তাহলে তা শুধু একটি অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত নয়, বরং একটি বড় ফৌজদারি মামলার রূপ নিতে পারে। অন্যদিকে, যদি প্রমাণিত হয় যে আগুন বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে লেগেছে, তাহলেও প্রশ্ন থাকবে— কেন এত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী সামগ্রী এমন একটি ভবনে রাখা হয়েছিল, যেখানে অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত ছিল না।

সম্ভাব্য প্রভাবের দিক থেকে দেখলে, প্রথমত সংশ্লিষ্ট ১০টি কেন্দ্রের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কোনও নির্বাচনী পিটিশন দাখিল হলে আদালতে প্রমাণ পেশ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, এই ঘটনার পর রাজ্যের অন্য জেলাগুলিতেও ইভিএম সংরক্ষণের স্থান ও সুরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তৃতীয়ত, জাতীয় স্তরেও নির্বাচন কমিশনের কাছে ইভিএম সংরক্ষণ প্রোটোকল আরও কঠোর করার দাবি উঠতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে এই ঘটনা ভারতের নির্বাচনী পরিকাঠামো ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে— বিশেষ করে স্ট্রংরুমের অবস্থান নির্বাচন, অগ্নি-নিরাপত্তা যাচাই এবং সিসিটিভি নজরদারির ক্ষেত্রে।

পরিসংখ্যান ও প্রেক্ষাপট

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় মোট ২৯৪টি আসন রয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে রাজ্যজুড়ে রেকর্ড সংখ্যক ভোটার ভোট দিয়েছেন, যা রাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ ভোটদানের হার বলে জানা গিয়েছে। এই নির্বাচনের ফলাফল রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন এনেছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রায় ৪,০০০ ইভিএম একসঙ্গে নষ্ট হওয়ার অর্থ হল, রাজ্যের প্রায় ৩.৪ শতাংশ বিধানসভা কেন্দ্রের (১০টি কেন্দ্র, মোট ২৯৪টির মধ্যে) ভোটগ্রহণের সরঞ্জাম একসঙ্গে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। সাধারণত একটি বিধানসভা কেন্দ্রে কয়েকশো পোলিং বুথ থাকে এবং প্রতিটি বুথের জন্য আলাদা কন্ট্রোল ইউনিট, ব্যালট ইউনিট ও ভিভিপ্যাট ব্যবহার করা হয়।

ভোট গণনার পরে ব্যবহৃত ইভিএমগুলি সাধারণত জেলা প্রশাসনের সুরক্ষিত স্ট্রংরুমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। এই স্ট্রংরুমগুলিতে সাধারণত কড়া সিসিটিভি নজরদারি, পুলিশি প্রহরা এবং সিল করা দরজার ব্যবস্থা থাকে। আলিপুরের এই ভবনেও নির্বাচন সংক্রান্ত দফতর ও স্ট্রংরুম ছিল উপরের তলাগুলিতে, যা তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত অংশ হিসেবে বিবেচিত হত।

এর আগেও দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ইভিএম পরিবহন বা সংরক্ষণ নিয়ে বিতর্কের ঘটনা সামনে এসেছে। তবে একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক ইভিএম আগুনে নষ্ট হওয়ার ঘটনা রাজ্যের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ইতিহাসে নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া

ঘটনার খবর সামনে আসার পর থেকেই সাধারণ মানুষ এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সরকারি সম্পদ কীভাবে এমন একটি ভবনে রাখা হয়েছিল, যেখানে অন্য সাধারণ দফতরও কাজ করত।

সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ এই ঘটনার স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ যত দ্রুত সম্ভব জনসমক্ষে আনা উচিত, যাতে গুজব এবং রাজনৈতিক চাপান-উতোর কম হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানিয়েছেন, আগুন লাগার সময় ভবনের আশপাশের এলাকায় ধোঁয়া দেখা গিয়েছিল এবং দমকল বাহিনীকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়েছিল। তবে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিবরণের জন্য প্রশাসনিক রিপোর্টের উপরেই নির্ভর করতে হচ্ছে।

উপসংহার

সংক্ষেপে বলা যায়, ১০ জুন ২০২৬ তারিখে দক্ষিণ কলকাতার আলিপুরে অবস্থিত একটি নয়তলা সরকারি ভবনে ভয়াবহ আগুন লেগে প্রায় ৪,০০০ ইভিএম— যার মধ্যে কন্ট্রোল ইউনিট, ব্যালট ইউনিট এবং ভিভিপ্যাট অন্তর্ভুক্ত— সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এই যন্ত্রগুলি সদ্য সমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ১০টি কেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়েছিল।

আগুনের অস্বাভাবিক বিস্তারের কারণে রাজ্যের দমকল প্রতিমন্ত্রী নিজেই নাশকতার সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিতে পারেননি। এর পরেই পুলিশ এফআইআর দায়ের করে সিট গঠন করেছে এবং ফরেনসিক দল নমুনা সংগ্রহ করেছে। তবে তাপমাত্রা বেশি থাকায় বিস্তারিত পরীক্ষা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।

রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে— একদিকে নাশকতা ও প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ, অন্যদিকে প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ। নির্বাচন কমিশনের তরফে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। ফরেনসিক রিপোর্ট এবং সিটের তদন্তের ফলাফলের উপরেই নির্ভর করছে এই রহস্যের আসল উত্তর। যতদিন না সম্পূর্ণ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, ততদিন এই ঘটনা ঘিরে জল্পনা অব্যাহত থাকবে।

(এই প্রতিবেদনটি সরকারি বিবৃতি, পুলিশি সূত্র এবং একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। তদন্ত চলমান থাকায় তথ্য পরিবর্তিত বা সংযোজিত হতে পারে।)

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQ)

১. কলকাতার ইভিএম অগ্নিকাণ্ড ঠিক কখন ঘটেছিল?

এই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ১০ জুন ২০২৬, বুধবার। দক্ষিণ কলকাতার আলিপুর এলাকার একটি নয়তলা সরকারি ভবনে আচমকা আগুন ধরে যায়, যা পরে উপরের তলাগুলিতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

২. ঠিক কোথায় এই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে?

ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ কলকাতার আলিপুরে অবস্থিত দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের ভবনে। এই নয়তলা ভবনে জেলা পরিষদের পাশাপাশি সর্বশিক্ষা মিশন, মিড-ডে মিল এবং উদ্যানপালন দফতরের অফিসও ছিল। উপরের তলাগুলিতে ছিল নির্বাচন সংক্রান্ত দফতর ও ইভিএম স্ট্রংরুম।

৩. এই অগ্নিকাণ্ডে কতগুলি ইভিএম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?

প্রাথমিক হিসেব অনুযায়ী, প্রায় ৪,০০০ ইভিএম সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে কন্ট্রোল ইউনিট, ব্যালট ইউনিট এবং ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেল বা ভিভিপ্যাট মেশিন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

৪. পুড়ে যাওয়া ইভিএমগুলি কোন নির্বাচনে ব্যবহৃত হয়েছিল?

রাজ্যের দমকল প্রতিমন্ত্রীর বিবৃতি অনুযায়ী, এই ইভিএমগুলি সদ্য সমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের ১০টি বিধানসভা কেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়েছিল। যদিও সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলির চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক তালিকা নির্বাচন কমিশনের তরফে নিশ্চিত করা হয়নি।

৫. এই আগুন কি নাশকতার ফলে লেগেছিল?

এখনও পর্যন্ত এটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। রাজ্যের দমকল প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগুনের অস্বাভাবিক বিস্তারের প্যাটার্ন দেখে এটিকে "স্বাভাবিক আগুন" বলে মনে হচ্ছে না এবং নাশকতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ফরেনসিক রিপোর্ট আসার পরই এই বিষয়ে নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যাবে।

৬. এই ঘটনার তদন্তের জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

কলকাতা পুলিশ ঘটনার পরেই একটি এফআইআর দায়ের করেছে এবং একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করেছে। এই দলে রয়েছেন একজন সহকারী পুলিশ কমিশনার এবং গোয়েন্দা বিভাগের অভিজ্ঞ আধিকারিকরা। পাশাপাশি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন, যা পরীক্ষা করে আগুনের কারণ নির্ধারণ করার চেষ্টা চলছে।

৭. ইভিএম পুড়ে যাওয়ার ফলে নির্বাচনের ফলাফলে কি কোনও প্রভাব পড়বে?

সরাসরি ফলাফলে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম, কারণ ভোট গণনা ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে এবং ফলাফল ঘোষিত হয়ে গিয়েছে। তবে সমস্যা হল, যদি ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট কোনও কেন্দ্রের ফলাফল নিয়ে আদালতে নির্বাচনী পিটিশন দাখিল হয়, তাহলে মূল ইভিএম প্রমাণ হিসেবে পাওয়া যাবে না। এটিই এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও গণতান্ত্রিক উদ্বেগের জায়গা।

৮. নির্বাচন কমিশন এই বিষয়ে কী প্রতিক্রিয়া দিয়েছে?

এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের তরফে এই ঘটনা নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। তবে কমিশনের প্রতিনিধি ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা পুড়ে যাওয়া ইভিএমের অবশিষ্টাংশ পরিদর্শনের জন্য প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।

৯. এই ঘটনায় রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিক্রিয়া কেমন?

তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনাকে নিরাপত্তার বড় গাফিলতি এবং সম্ভাব্য প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা বলে অভিযোগ করেছে। অন্যদিকে বিরোধী শিবির এই ঘটনার জন্য রাজ্য প্রশাসনের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছে। কংগ্রেস নেতা পবন খেরা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কাছে এই ইভিএমগুলির ব্যাপারে স্পষ্টীকরণ দাবি করেছেন।

১০. ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইভিএম এবং নির্বাচন সংক্রান্ত নথি রাখার জন্য নির্দিষ্ট, অগ্নি-নিরাপদ এবং একক-উদ্দেশ্যের স্ট্রংরুম তৈরি করা প্রয়োজন, যা অন্য সাধারণ সরকারি দফতরের সঙ্গে একই ভবনে না থাকাই ভালো। এর পাশাপাশি নিয়মিত অগ্নি-নিরাপত্তা পরিদর্শন, আধুনিক ফায়ার অ্যালার্ম ব্যবস্থা, সিসিটিভি নজরদারি এবং চব্বিশ ঘণ্টা সুরক্ষাকর্মী নিয়োগের মতো ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।

Previous Post Next Post