অরণ্যসুন্দরী ঝাড়গ্রাম: শাল-পিয়ালের জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়ার একটা আস্ত দুপুর
শহরের কংক্রিটের খাঁচায় যখন দমবন্ধ লাগে, তখন মন চায় এমন কোথাও পালিয়ে যেতে যেখানে ফোনের সিগন্যাল দুর্বল হলেও প্রকৃতির সাথে সংযোগটা হয় বেশ জোরালো। ঠিক এমনই এক গন্তব্য হলো আমাদের খুব কাছের ঝাড়গ্রাম জঙ্গল। লাল মাটির রাস্তা, দুপাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা শাল-মহুলের গাছ আর নাম না জানা পাখির ডাক—সব মিলিয়ে ঝাড়গ্রাম মানেই একরাশ সতেজ অক্সিজেন।
ছোটবেলায় ভূগোলে পড়া সেই জঙ্গলমহল যে এত সুন্দর হতে পারে, সেটা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। চলুন আজ আপনাদের নিয়ে যাই লাল মাটির দেশে, যেখানে জঙ্গল কথা বলে আর ইতিহাস ফিসফিস করে গল্প শোনায়।
ঝাড়গ্রাম জঙ্গল আসলে কোথায়?
পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম জেলায় অবস্থিত এই জঙ্গল মূলত ছোটনাগপুর মালভূমির একটি অংশ। কলকাতা থেকে এর দূরত্ব মাত্র ১৬০-১৭০ কিলোমিটারের মতো। খাস ঝাড়গ্রাম শহরকে কেন্দ্র করেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেলপাহাড়ি, কাঁকরাঝোর বা জামবনির মতো গভীর জঙ্গলগুলো। এটি কেবল পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং বাঙালির কাছে এক টুকরো শান্তি খুঁজে পাওয়ার ঠিকানা।
কিভাবে যাবেন? (বাজেট ফ্রেন্ডলি রুট)
ঝাড়গ্রাম যাওয়ার সবচেয়ে সহজ এবং সাশ্রয়ী উপায় হলো ট্রেন।
* ট্রেনে: হাওড়া থেকে সকাল সকাল 'হাওড়া-ঝাড়গ্রাম মেমু' বা 'স্টিল এক্সপ্রেস' ধরে নিন। মাত্র আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যেই আপনি পৌঁছে যাবেন ঝাড়গ্রাম স্টেশনে। ট্রেনের জানলা দিয়ে যখন দূরে দূরে পাহাড় আর জঙ্গল উঁকি দেবে, বুঝবেন আপনার সফর শুরু হয়ে গেছে।
* বাসে: ধর্মতলা বা করুণাময়ী থেকে ঝাড়গ্রাম যাওয়ার সরাসরি বাস পাওয়া যায়। তবে জঙ্গলমহলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ট্রেন ভ্রমণই সেরা।
* ব্যক্তিগত গাড়ি: যদি নিজের গাড়িতে যেতে চান, তবে ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক (NH6) ধরে খড়গপুর হয়ে ঝাড়গ্রাম পৌঁছানো যায়। রাস্তা বেশ সুন্দর, ড্রাইভ করতে ভালোই লাগবে।
কখন যাবেন এই অরণ্যসুন্দরীর টানে?
ঝাড়গ্রাম জঙ্গল ঘোরার আসল মজা হলো বর্ষা আর শীতকালে।
১. বর্ষায়: এই সময় জঙ্গল একেবারে নবযৌবনা। বৃষ্টির ফোঁটায় শাল পাতার গাঢ় সবুজ রঙ চোখ জুড়িয়ে দেয়।
২. শীতকালে: নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি হলো ভ্রমণের আদর্শ সময়। রোদ ঝলমলে দিনে জঙ্গলের পথে হাঁটতে বা চিলকিগড়ে পিকনিক করতে এর চেয়ে ভালো সময় আর হয় না।
বিশেষ টিপস: গরমকালে জঙ্গলমহলে না যাওয়াই ভালো, কারণ লাল মাটির তপ্ত গরম সহ্য করা একটু কঠিন হতে পারে।
আমার ডায়েরি থেকে: এক অদ্ভুত ভালোলাগার বিকেল
স্টেশনে নেমে যখন প্রথমবার একটা টোটো নিয়ে জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে চলা শুরু করলাম, নাকে এল সোঁদা মাটির আর মহুলের মিষ্টি গন্ধ। ঝাড়গ্রাম জঙ্গল ঠিক যেন একটা জীবন্ত ক্যানভাস। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল চিলকিগড় কনকদুর্গা মন্দির। গভীর জঙ্গলের বুক চিরে তৈরি হওয়া রাস্তা দিয়ে যখন এগোচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল কোনো সিনেমার দৃশ্য।
চিলকিগড় মন্দিরের বিশেষত্ব হলো এখানকার শতাব্দী প্রাচীন সব গাছ। এখানকার ডুলুং নদী যখন শান্ত মনে বয়ে চলে, তখন নদীর পাড়ে বসে অনেকটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। আমার মনে আছে, একটা বড় গাছের নিচে বসে যখন বাতাসের শনশন শব্দ শুনছিলাম, মনে হচ্ছিল শহুরে সব ক্লান্তি ডুলুং নদীর জলেই ধুয়ে মুছে গেল।
এরপর আমরা গিয়েছিলাম ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি। ঐতিহাসিক স্থাপত্য আর রাজকীয় আভিজাত্য আজও সেখানে অমলিন। রাজবাড়ির চত্বরে দাঁড়িয়ে যখন সূর্যাস্ত দেখছিলাম, আকাশটা একদম সিঁদুরে লাল হয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, এই মাটির রং আর আকাশের রং যেন এক হয়ে মিশে গেছে।
স্থানীয় খাবার, সংস্কৃতি ও অদেখা কিছু কোণ
ঝাড়গ্রামে এসে যদি মহুল ফুল বা স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতির ছোঁয়া না নিলেন, তবে ভ্রমণটাই অসম্পূর্ণ। এখানকার স্থানীয় গ্রামগুলোতে গেলে দেখবেন মাটির বাড়ির দেওয়ালে নিখুঁত আলপনা।
কী খাবেন?
* মাটির হাঁড়ির মাংস: অনেক হোমস্টে বা স্থানীয় দোকানে মাটির হাঁড়িতে রান্না করা কচি পাঁঠার মাংস পাওয়া যায়। শাল পাতায় গরম ভাত আর সেই মাংসের স্বাদ সারাজীবন মনে থাকবে।
* পিঠা: এখানকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিশেষ এক ধরণের পিঠা, যা খেতে দারুণ সুস্বাদু।
* পোস্ত বড়া: বাংলার এই সিগনেচার ডিশটি এখানেও বেশ জনপ্রিয়।
বাজেট কত হতে পারে? (হিসেবটা দেখে নিন)
খুব কম খরচে ঝাড়গ্রাম ঘুরে আসা সম্ভব।
* যাতায়াত: ট্রেন ভাড়া (যাওয়া-আসা) ২০০-৩০০ টাকা। স্থানীয় টোটো রিজার্ভ করলে সারা দিনের জন্য ৫০০-৮০০ টাকা (গ্রুপে গেলে শেয়ার করা যায়)।
* থাকা: এখানে ৮০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত হোটেল বা হোমস্টে আছে।
* খাওয়া: সারাদিনে ৩০০-৫০০ টাকায় পেটপুরে খাওয়া দাওয়া সম্ভব।
মোটামুটি ৩০০০-৪০০০ টাকার মধ্যে দুই দিন এক রাতের একটা দুর্দান্ত ট্রিপ সেরে ফেলা যায়।
ভ্রমণের আগে কিছু জরুরি টিপস
১. জঙ্গলে একা না ঘোরা: জঙ্গল খুব সুন্দর হলেও বিকেল ৫টার পর গভীর জঙ্গলে একা না থাকাই ভালো।
২. প্লাস্টিক বর্জন: জঙ্গল আমাদের সম্পদ। দয়া করে চিপসের প্যাকেট বা জলের বোতল যেখানে সেখানে ফেলবেন না।
৩. নগদ টাকা: অনেক সময় জঙ্গলের ভেতরে ইন্টারনেটের সমস্যা থাকে, তাই কিছু ক্যাশ টাকা সাথে রাখুন।
৪. মশা তাড়ানোর ক্রিম: জঙ্গলে মশার উপদ্রব থাকতে পারে, ওডোমস সাথে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
বাঙালির কাছে ঝাড়গ্রাম জঙ্গল কেন স্পেশাল?
আমরা বাঙালিরা একটুতেই আবেগপ্রবণ। আমাদের কাছে জঙ্গল মানেই বিভূতিভূষণের 'আরণ্যক' বা ফেলুদার কোনো রহস্য রোমাঞ্চ। ঝাড়গ্রাম জঙ্গল আমাদের সেই নস্টালজিয়াকে উসকে দেয়। খুব কাছেই অথচ একদম অন্যরকম একটা পরিবেশ। এখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে শুধু প্রকৃতির অকৃপণ দান। যারা একটু নির্জনে নিজের সাথে কথা বলতে চান, তাদের জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর নেই।
FAQ: ঝাড়গ্রাম নিয়ে কিছু কমন প্রশ্ন
১. ঝাড়গ্রাম কি নিরাপদ?
হ্যাঁ, বর্তমানে ঝাড়গ্রাম পর্যটকদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে স্থানীয় গাইড বা চালকের পরামর্শ মেনে চলা ভালো।
২. এক দিনে কি ঝাড়গ্রাম ঘুরে আসা যায়?
হ্যাঁ, কলকাতা থেকে সকালের ট্রেন ধরে রাতে ফিরে আসা যায়। তবে ভালো করে জঙ্গল উপভোগ করতে অন্তত এক রাত থাকা দরকার।
৩. দেখার মতো সেরা জায়গাগুলো কী কী?
কনকদুর্গা মন্দির, চিলকিগড় রাজবাড়ি, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি, ডুলুং নদী, বেলপাহাড়ি এবং জঙ্গলমহল জুলজিক্যাল পার্ক (মিনি জু)।
৪. হাতি আসার ভয় আছে কি?
মাঝে মাঝে হাতি জঙ্গলের রাস্তায় চলে আসে, তবে পর্যটন এলাকাগুলোতে সাধারণত দিনে বেলা কোনো সমস্যা হয় না। বন দপ্তরের নির্দেশিকা মেনে চললে ভয়ের কিছু নেই।
৫. কোথায় থাকব?
ঝাড়গ্রাম ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স (WBTDCL) বা রাজবাড়ির গেস্ট হাউস সেরা। এছাড়া বর্তমানে প্রচুর ব্যক্তিগত হোমস্টে গড়ে উঠেছে।
শেষ কথা
সবশেষে একটাই কথা বলব, জীবন তো একটাই! সেই জীবনের ইঁদুর দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লে একবার ঘুরে আসুন ঝাড়গ্রাম জঙ্গল থেকে। শাল গাছের ছায়া আর ডুলুং নদীর হাওয়া আপনাকে নতুন করে বাঁচার রসদ দেবে। লাল মাটির সেই টান আপনি কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারবেন না।
আপনার কি জঙ্গল ভালো লাগে নাকি পাহাড়? আর ঝাড়গ্রাম গেলে কার সাথে যেতে চাইবেন? কমেন্টে ট্যাগ করুন আপনার সেই ভ্রমণ সঙ্গীটিকে! পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না।
জঙ্গলমহল পর্যটন, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি, চিলকিগড় কনকদুর্গা মন্দির, ডুলুং নদী, বেলপাহাড়ি ভ্রমণ, জঙ্গলমহল হোমস্টে, কলকাতার কাছে উইকএন্ড ট্যুর।
